Category Archives: স্বেচ্ছাসেবীদের লেখা

মোহন পথশিশু সেবা সংগঠন

ভালোবাসার এই অশেষ পণ্য কতজনাকেই তুমি দিয়ে ধন্য হতে চাও, বিলাতে চাও সর্বত্র। হতে চাও প্রেমপূজারি , কিন্তু একবার ভেবেছো কি তোমার এই মহামূল্যবান ভালোবাসার মূল্য কয়জনইবা দিচ্ছে , তবে একবার চোখ খুলে দেখো তোমার এই ভালোবাসার অল্প একটু পেতে হস্ত তুলে পূজায় মত্ত রয়েছে কষ্টে থাকা কতিপয় শিশু, একটু ভালোবাসা পেলেই রাস্তার এই পড়ে থাকা গোলাপরা সমাজে স্বপ্ন-আশার গন্ধ ছড়াতে পারে, পারে অথৈ মেধার মস্তিষ্ককে মাদকে না ঠেলে সমাজের কাজে লাগাতে। কষ্টে থাকা কতিপয় পথশিশুর কথা বলছি, এদের কারো কারো মা-নেই, বাবা নেই, কারো সব থেকেও নেই, ক্ষুধার কষ্টে তারা আজ নষ্ট পথের যাত্রী। ভালোবাসা নামক শব্দটি তাদের কাছে অমাবস্যা তিথি। তুমি তোমার একটু ভালোবাসা দিলেই এই শিশুরা অকালে ঝরে পড়েনা, হয়না চোর ,ডাকাত , খুনি। বন্ধুরা যাদের একবেলা মুখের অন্য যোগাতে নুন আনতে পান্তা পুরায়, পেটের দায়ে তারা খুন করবেই। অপরাধ বিজ্ঞান আমি ঠিক জানিনা তবে মানি মানুষ তখনই অপরাধী হয়, যখন কষ্ট , ক্ষুধায়, বৈষম্যে তার চোখে অনিচ্ছায় জল বয়। এসো বন্ধু একটু ভালোবাসা দিয়ে সমাজে ভালোবাসার অভাবে নষ্ট পথে থাকা এই গোলাপ কলি নামক পথশিশুদের মানব গোলাপ হয়ে ফুটতে দিই। দিনে না পারো , সপ্তাহে না পারো অন্তত মাসে একটি দিন সময় দিয়ে ভালোবাসা দাও, দেখবে সমাজে কালোর আভা কেটে গিয়ে আলোর বন্যা বইবে। যদি কারো মনে একটু ভালোবাসা থাকে এই শিশুদের কল্যাণে দেওয়ার জন্য , চলে আসো । যোগাযোগ করো আমার সাথে, যোগ হও পথশিশু সেবা সংগঠনের সাথে। আমরা সপ্তাহে ৬ দিন রাজধানীর সদরঘাট , কমলাপুর, মহাখালি, কাওরান বাজার, নিউমার্কেট , গাবতলিতে ভালোবাসার বিনিময় করি, তোমার যেখানে ভালো লাগে চলে আসো , আর ভালোবাসো পথশিশুদের ।

 1401572_651445774876151_105450330_o

পদ্মা নদীর মাঝি

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করি বেশ কিছুদিন ধরে। কিন্তু কাল একটি করুণ পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়েছিলাম।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার “পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে” জেলেদের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন এরা গরিবের থেকেও গরিব, ছোট লোকের থেকেও ছোটলোক। কিন্তু আমাদের পথশিশুদের অবস্থা ত দেখি তার থেকেও করুন। রিস্কা, ভ্যান চালক এদের ধরে পিটায়। ফুটপাতের ক্ষুদে দোকানদার এদের তাড়ায়। এরা চোখের ও মনের সুন্দর বিনষ্টকারী তাই রাস্তার সাহেবরা তাকাতেও অনিচ্ছুক।

গতকালের একটা ইভেন্ট ছিল পছন্দের মানুষের ছবি আঁকা। একটা ছেলে তার সমবয়সী ছোট বোনের ছবি একেছিল।তার এই বোনটিকে ৮-১০ বছর আগে ওর মা বিক্রি করে দিয়েছিল।আমাদের এক সহকর্মী(লতা আপু যিনি ব্যক্তিগত ভাবে তাকে চিনেন)বলল তোমার বোনত ছোট কিন্তু চুল বড় কেন?সে বলল “আপু ও বড় হইছে না!”

আমরা সবাই নির্বাক হয়ে গেলাম। আমরা ভুলেই গেছি এদেরও একটা জীবন আছে, সুন্দর গল্প আছে। নির্মম কঠিন জীবন যাপনের মাঝেও মনের কোনে লুকিয়ে আছে মমতা, ভালবাসা, সজন হারানোর তিক্ত কঠিন বাস্তবতা।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার আইনে স্বাক্ষর কারি দেশ হিসেবে এদের অন্ন, বস্র,বাসস্থানের ব্যবস্তা করা সরকারে দায়িত্ত।কিন্তু তাঁরা ব্যস্ত আছে দেশকে কীভাবে উন্নত দেশ,মধ্য আয়ের দেশ, ধনী দেশ, ডিজিটাল দেশ করা যায়।এত সব কাজের মাঝে এদের দিকে তাকানোর সময় কোথায়।নৈতিকতা আর মানবিকতার পতাকাবাহী মধ্যবিত্তরা ডুবে আছে আকণ্ঠ ভোগবিলাসীতায়।

আব্দুল হাই রাসেল
পথশিশু সেবা সংগঠন।

প্রিয় বন্ধুরা শুভ সকাল

উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট জোসে মুজিকা’র ছুঁয়ে যাওয়া একটি উক্তি দিয়ে লেখা শুরু করছি। ‘দরিদ্র তারাই যারা সারাটা জীবন কেবল ভোগ্যপণ্য কেনার অর্থ জোগাড় করতে দাসের মতো খেটে যাচ্ছে’। আমি বা আমরাও মূলত তা-ই করছি। আর যারা এর বাইরে চিন্তা করতে পারেন, তারাই অনন্য মানুষ। অনন্য মানুষ হয়তো আমরা অনেকেই হতে চাই, কিন্তু অনন্য মানুষ হওয়ার জন্য যে কাজ করতে হয় তা করি না বা করতে জানি না। শুধুই ভোগ করার জন্য উপরওয়ালা আমাদের পাঠান নি; একটু খানি ত্যাগ ই নিজেকে অনন্য মানুষ করে তুলতে পারে। এই ত্যাগ হতে পারে অনেক ভাবে। চোখের সামনে পড়ে থাকা কলার ছোকলা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে একজন মুমূর্ষু রোগীকে রক্ত দেওয়া, অনাহারীকে খাবার দেওয়া, একজন বিপথগামী মানুষকে সঠিক পথ দেখানো কিংবা রাস্তায় বেড়ে ওঠা নিজের নাম পরিচয় না জানা শিশুটির অব্যক্ত কথাগুলো শোনা অথবা মাঝরাতে বিপদগ্রস্ত কোন মানুষের ডাকে ছুটে যাওয়া; সবই অনন্য মানুষের কাজ। মূলত যার যার অবস্থান থেকে মানুষের জন্য কিছু করতে চাওয়ার প্রবল ইচ্ছাই বদলে দিতে পারে সুবিধা বঞ্চিত কিছু মানুষের জীবন। তবে কেন এই বদলে দেওয়াটা আমাদের হাত ধরেই নয়?? 

– ইমরান
পথশিশু সেবা সংগঠন

পথের কান্না

বছর কয়েক আগের ঘটনাটা কমলাপুরের। মলিন পরিধেয়, জটা চুলো দশ-বারো বছরের বালক সামনে এসে দাঁড়ালো। শরীর এতটাই ময়লা যে চারপাশে মাছি ভীনভীন করছে। গা থেকে উটকো গন্ধ। কতদিন গোসল নেই কে জানে? কাছে ভিড়তেই ভেতরে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। বুঝি পেট খালি হয়ে যাবে! বাইরে বুঝতে না দিলেও ওর শরীর আর আচ্ছাদনের গন্ধ নিশ্চয়ই আমার কাছে আতরের মত লাগছিলো না। সত্যি খুব ঘৃণা হচ্ছিলো। মানুষের গা থেকে এমন গন্ধ আসতে পারে? এমন ময়লা মানুষের সাথে কথা বলা যায়?
হঠাৎ পেছন থেকে হাউ-মাউ করে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। এক মহিলা বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরলেন। বুকের ভেতর আগলে রেখে বার বার গালে,ঠোঁটে, কপালে চুমু খেতে লাগলেন, “ ওরে বাজান রে এতদিন কই ছিলি? আমার কলজে পুইড়ে গেল রে ! ও জানের বাজান ……… ”
মহিলার কান্না, বিলাপ আর সন্তান ফিরে পাবার আনন্দ দেখে চোখে পানি এসে গেল। যে ছেলেটাকে এতক্ষন ঘৃণা করছিলাম, যার পাশে বসতেও দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছিলাম ; তার প্রতি এত মায়া দেখানোর লোক আছে ! এই জগতে এমন ময়লা বাচ্চার গালে, মুখে চুমু খাওয়ারও মানুষ আছে !
ময়লা আবরণটি খুলে ফেলে মহিলাটা আঁচল দিয়ে গা মুছে দিলেন। যেন হারিয়ে যাওয়া কোন স্বর্ণখণ্ডের ময়লা মুছে দিচ্ছেন। গায়ের চাদর জড়িয়ে বাচ্চাটিকে একবারে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলেন।
চোখের সামনে থেকে যেন পর্দা সরে গেল। মনে পড়ল, আমিও ছোটবেলায় একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম। যে কয়দিন নিখোঁজ ছিলাম মা আমার অন্ন গ্রহণ করেন নি, গোসল করেন নি, শুধু কেঁদেছেন। সকাল-সন্ধ্যা প্রার্থনা করেছেন। যেদিন ফিরলাম আমার মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিলেন।
সত্যি, ঘটনাটা সামান্য হলেও এর গভীরতা, আবেগ এবং মাতৃ হৃদয়ের বিহ্বলতা দেখে চোখে পানি ধরে রাখতে পারলাম না।
রাস্তায় এত পথশিশু। ডাস্টবিনঘাটা বাচ্চা হাত-নখে কালো ময়লার আস্তরণ। ময়লার গন্ধে মাছি পিছু পিছু ঘোরে। এদের কি মা নেই? হ্যা, প্রত্যেকেরই মা আছে। তবে এরা রাস্তায় কেন? প্রশ্নটা যত গম্ভীর, উত্তরটাও ততো গম্ভীর ও মর্মস্পর্শী। মায়ের সাথে শিশুর যে আত্মিক বন্ধন থাকে পৃথিবীতে আর কারও সাথে তা গড়ে ওঠে না। তবে কেন এই অভাগাদের ঠাই হয় শহরের এই ভাগার গুলোতে?
আসলে সমস্যাটা অন্য কোথাও। সমাজ কাঠামোর গভীরে বৈষম্য-দারিদ্র্যতা আর শোষণের ঘুণপোকা কুটকুট করে অন্তঃসার শূন্য করে দিচ্ছে- আমরা বুঝতে পারছি না। হয়তো দেখবো গোটা সমাজের মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়েছে। ধনীদের অর্থ, জৌলুস আর শোষণের ডামাডোলের নিচে পড়ে আছে এই অসহায় দরিদ্র, স্নেহবঞ্চিত মানুষ। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে যাওয়া মানুষদের যেমন চোখের সামনে মরতে দেখলাম, তেমনি এইসব মানুষগুলোও সমাজ কাঠামোর ধ্বংসস্তূপের নিচে একদিন অস্তিত্ব হারাবে, কোন অধিকারই তাদের থাকবে না; হয়তো এটাও দেখতে হবে আমাদের।
কেউ কি নেই? এই হৃদয় ভাঙা মানুষ-অসহায় শিশুদের অধিকারের ফর্দ হাতে নিয়ে ঐ উঁচু তলায় পৌঁছে দিবে? হারিয়ে যাওয়া শিশুকে তার মায়ের বুকে পৌঁছে দেবার আনন্দে অংশীদার হবে? কেউ কি আছো?

সিরাজুম মুনীর (সাজিদ)
পথশিশু সেবা সংগঠন
০২/১০/২০১৪