পথের কান্না

বছর কয়েক আগের ঘটনাটা কমলাপুরের। মলিন পরিধেয়, জটা চুলো দশ-বারো বছরের বালক সামনে এসে দাঁড়ালো। শরীর এতটাই ময়লা যে চারপাশে মাছি ভীনভীন করছে। গা থেকে উটকো গন্ধ। কতদিন গোসল নেই কে জানে? কাছে ভিড়তেই ভেতরে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। বুঝি পেট খালি হয়ে যাবে! বাইরে বুঝতে না দিলেও ওর শরীর আর আচ্ছাদনের গন্ধ নিশ্চয়ই আমার কাছে আতরের মত লাগছিলো না। সত্যি খুব ঘৃণা হচ্ছিলো। মানুষের গা থেকে এমন গন্ধ আসতে পারে? এমন ময়লা মানুষের সাথে কথা বলা যায়?
হঠাৎ পেছন থেকে হাউ-মাউ করে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। এক মহিলা বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরলেন। বুকের ভেতর আগলে রেখে বার বার গালে,ঠোঁটে, কপালে চুমু খেতে লাগলেন, “ ওরে বাজান রে এতদিন কই ছিলি? আমার কলজে পুইড়ে গেল রে ! ও জানের বাজান ……… ”
মহিলার কান্না, বিলাপ আর সন্তান ফিরে পাবার আনন্দ দেখে চোখে পানি এসে গেল। যে ছেলেটাকে এতক্ষন ঘৃণা করছিলাম, যার পাশে বসতেও দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছিলাম ; তার প্রতি এত মায়া দেখানোর লোক আছে ! এই জগতে এমন ময়লা বাচ্চার গালে, মুখে চুমু খাওয়ারও মানুষ আছে !
ময়লা আবরণটি খুলে ফেলে মহিলাটা আঁচল দিয়ে গা মুছে দিলেন। যেন হারিয়ে যাওয়া কোন স্বর্ণখণ্ডের ময়লা মুছে দিচ্ছেন। গায়ের চাদর জড়িয়ে বাচ্চাটিকে একবারে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলেন।
চোখের সামনে থেকে যেন পর্দা সরে গেল। মনে পড়ল, আমিও ছোটবেলায় একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম। যে কয়দিন নিখোঁজ ছিলাম মা আমার অন্ন গ্রহণ করেন নি, গোসল করেন নি, শুধু কেঁদেছেন। সকাল-সন্ধ্যা প্রার্থনা করেছেন। যেদিন ফিরলাম আমার মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিলেন।
সত্যি, ঘটনাটা সামান্য হলেও এর গভীরতা, আবেগ এবং মাতৃ হৃদয়ের বিহ্বলতা দেখে চোখে পানি ধরে রাখতে পারলাম না।
রাস্তায় এত পথশিশু। ডাস্টবিনঘাটা বাচ্চা হাত-নখে কালো ময়লার আস্তরণ। ময়লার গন্ধে মাছি পিছু পিছু ঘোরে। এদের কি মা নেই? হ্যা, প্রত্যেকেরই মা আছে। তবে এরা রাস্তায় কেন? প্রশ্নটা যত গম্ভীর, উত্তরটাও ততো গম্ভীর ও মর্মস্পর্শী। মায়ের সাথে শিশুর যে আত্মিক বন্ধন থাকে পৃথিবীতে আর কারও সাথে তা গড়ে ওঠে না। তবে কেন এই অভাগাদের ঠাই হয় শহরের এই ভাগার গুলোতে?
আসলে সমস্যাটা অন্য কোথাও। সমাজ কাঠামোর গভীরে বৈষম্য-দারিদ্র্যতা আর শোষণের ঘুণপোকা কুটকুট করে অন্তঃসার শূন্য করে দিচ্ছে- আমরা বুঝতে পারছি না। হয়তো দেখবো গোটা সমাজের মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়েছে। ধনীদের অর্থ, জৌলুস আর শোষণের ডামাডোলের নিচে পড়ে আছে এই অসহায় দরিদ্র, স্নেহবঞ্চিত মানুষ। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে যাওয়া মানুষদের যেমন চোখের সামনে মরতে দেখলাম, তেমনি এইসব মানুষগুলোও সমাজ কাঠামোর ধ্বংসস্তূপের নিচে একদিন অস্তিত্ব হারাবে, কোন অধিকারই তাদের থাকবে না; হয়তো এটাও দেখতে হবে আমাদের।
কেউ কি নেই? এই হৃদয় ভাঙা মানুষ-অসহায় শিশুদের অধিকারের ফর্দ হাতে নিয়ে ঐ উঁচু তলায় পৌঁছে দিবে? হারিয়ে যাওয়া শিশুকে তার মায়ের বুকে পৌঁছে দেবার আনন্দে অংশীদার হবে? কেউ কি আছো?

সিরাজুম মুনীর (সাজিদ)
পথশিশু সেবা সংগঠন
০২/১০/২০১৪

Leave a Reply